India & World UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

শবেবরাতের রাতে আল্লাহ সবাইকে ক্ষমা করে দেন

ওয়েটুবরাক, ৩১ জানুয়ারি: আল্লাহ তা‘আলা ইমানের নেয়ামত দান করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সত্য ও সঠিক পথ দেখিয়েছেন। তিনি দ্বীনের প্রতিটি বিষয়ে আমাদের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রেখে গেছেন।

শা‘বান মাস ও এর মধ্যরাত্রি সাধারণভাবে শবে বরাত নামে পরিচিত। এ বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি লক্ষ্য করা যায়। কেউ কেউ এর ফজিলতকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে, আবার কেউ কেউ এর নামে বিভিন্ন অশোভন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। অথচ কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এই রাত্রির মর্যাদা প্রমাণিত।

শব ফার্সি শব্দ, যার অর্থ রজনী বা রাত্রি। বরাত আরবি শব্দ, যার অর্থ মুক্তি পাওয়া, নাজাত পাওয়া বা রক্ষা পাওয়া। হাদিসে এই রাত্রিকে লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান বলা হয়েছে, আরবিতে লাইলাতুল বারাআত। এই রাত্রিতে অনেক বান্দার গুনাহ ক্ষমা করা হয় এ জন্য সেটাকে শবে বরাত বলে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা শা‘বান মাসের মধ্যরাতে (লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান) তাঁর সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং সবাইকে ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতএব যে ব্যক্তি তাঁর প্রতিপালকের সাক্ষাৎ প্রত্যাশা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তাঁর প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকেই শরিক না করে।”  অর্থাৎ লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে না করে।

বিদ্বেষ শয়তানের তৈরি আগুন, যা ইমানকে পুড়িয়ে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয়ই শয়তান চায় তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে।” রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “হিংসা ও বিদ্বেষ দ্বীনকে ধ্বংস করে দেয়। তোমাদের মধ্যে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের এক ব্যাধি প্রবেশ করেছে, তা হলো এই হিংসা ও বিদ্বেষ। এটি দ্বীনকে মু-ন করে অর্থাৎ ধ্বংস করে দেয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) পরস্পরে বিদ্বেষ নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা কু-ধারণা থেকে দূরে থাকো; কেননা কু-ধারণাই সবচেয়ে মিথ্যা কথা। একে অপরের গোপন দোষ খোঁজ করো না, গুপ্তচরবৃত্তি করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, হিংসা করো না; বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে ভাই-ভাই হিসেবে জীবন যাপন করো।”

নবী করীম (সা.) এ রাতে দীর্ঘ সময় নামাজ পড়তেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক রাতে রাসূলুল্লাহ (সা.) নামাজে দাঁড়ালেন। তিনি সিজদায় এত দীর্ঘ সময় থাকলেন যে আমার ধারণা হলো, তিনি হয়তো ইন্তেকাল করেছেন। তখন আমি উঠে গিয়ে তাঁর পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়ালাম। তা নড়ে উঠল। এরপর আমি ফিরে এলাম। নামাজ শেষ করে তিনি বললেন, “হে আয়েশা (বা হুমাইরা)! তুমি কি মনে করেছিলে যে আল্লাহর রাসূল তোমার প্রতি অসন্তুষ্ট হয়েছেন?” আমি বললাম না, আল্লাহর কসম! বরং আমি মনে করেছিলাম আপনি দীর্ঘ সিজদার কারণে ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বললেন, “তুমি কি জানো এটা কোন রাত?” আমি বললাম আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন, “এটি শা‘বানের মধ্যরাত্রি। এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের দিকে দৃষ্টি দেন। অতঃপর তিনি ক্ষমা করেন তাদের, যারা ক্ষমার উপযুক্ত; রহম করেন তাদের, যারা রহমতের উপযুক্ত; আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন।”

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “শা‘বানের মধ্যরাত্রি এলে তোমরা তার রাত জাগরণ করো এবং দিনে রোজা রাখো; কেননা আল্লাহ তা‘আলা সূর্যাস্তের সময় দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছে ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করব; কে আছে রিজিক প্রার্থনাকারী, আমি তাকে রিজিক দেব; কে আছে বিপদগ্রস্ত, আমি তাকে আরোগ্য দেব ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত।”

রাসূলুল্লাহ(সা.)–এর কাছে রোজা পালনের জন্য সবচেয়ে প্রিয় মাস ছিল শা‘বান। এরপর তিনি শা‘বান মাসকে রমজানের সঙ্গে যুক্ত করে রোজা রাখতেন।  হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কখনো কোনো মাসে সম্পূর্ণ রোজা রাখতে দেখিনি রমজান ছাড়া। আর আমি তাঁকে শা‘বান মাসে যত বেশি রোজা রাখতে দেখেছি, অন্য কোনো মাসে তত বেশি রাখতে দেখিনি।”

হযরত উসামা ইবন যায়দ (রা.) বলেন, “আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) আপনি শা‘বান মাসে অন্য মাসের তুলনায় বেশি রোজা রাখেন কেন? তিনি বললেন, “এটা এমন এক মাস, যা রজব ও রমজানের মাঝখানে হওয়ায় মানুষ অবহেলা করে; অথচ এ মাসেই আমলসমূহ বিশ্বজগতের রব আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। আর আমি পছন্দ করি আমার আমল তখন পেশ হোক, যখন আমি রোজাদার থাকি।”

পরিশেষে বলা যায়, শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফি মিন শা‘বান একটি মর্যাদাপূর্ণ ও ফজিলতপূর্ণ রাত। এই রাত্রির প্রকৃত শিক্ষা হলো তাওবা করা, বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হওয়া, অন্তর পরিষ্কার করা, হারাম থেকে বেঁচে থাকা। আমাদের উচিত এই রাত্রিকে কেন্দ্র করে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি উভয় পথ পরিহার করে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে সংযত ও সচেতন অবস্থান গ্রহণ করা। আল্লাহ তা‘আলা যেন আমাদেরকে শিরক, রিয়া ও বিদ্বেষ থেকে হেফাজত করেন এবং এই বরকতময় রাত্রিতে তাঁর রহমত ও মাগফিরাত লাভের তাওফিক দান করুন।

মানুষ যখন অহংকার, হিংসা ও প্রবৃত্তির অনুসরণে পথভ্রষ্ট হয়, তখন আল্লাহ তায়ালা কুরআনের মাধ্যমে আমাদের সামনে তাঁর প্রিয় বান্দাদের পরিচয় তুলে ধরেন, যেন আমরা তাঁদের অনুসরণ করে দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে পারি।

আল্লাহ তায়ালা সূরা আল-ফুরকানে ‘ইবাদুর রহমান’ অর্থাৎ রহমানের প্রিয় বান্দাদের কিছু মহৎ গুণাবলি তুলে ধরেছেন। সেগুলো হলো, “রহমানের বান্দারা হলো তারা, যারা পৃথিবীতে বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে; আর যখন অজ্ঞরা তাদের সঙ্গে কথা বলে, তখন তারা বলে সালাম’।” বিনয় অবলম্বনকারীকে আল্লাহ তায়ালা মর্যাদায় উন্নীত করেন। এ প্রসঙ্গে সূরা লোকমানে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তুমি পৃথিবীতে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয়ই তুমি কখনো পৃথিবীকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় পাহাড়সমূহের সমানও হতে পারবে না।”

বরং দোয়া করে বলো, হে আমাদের রব! আমাদের থেকে জাহান্নামের শাস্তি দূরে সরিয়ে দিন; নিশ্চয়ই তার শাস্তি চিরবিনাশকর। নিশ্চয়ই তা বসবাস ও আবাসস্থল হিসেবে নিকৃষ্ট।”

বিনয়, ইবাদত, আত্মসংযম, নৈতিক দৃঢ়তা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং কুরআনের প্রতি গভীর সংবেদনশীলতা এসব গুণ অর্জনের মধ্যেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে যেন রহমানের প্রিয় বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করেন, তাঁদের চরিত্র আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের তাওফিক দান করেন এবং জান্নাতুল ফিরদাউসে তাঁদের সান্নিধ্য লাভের সৌভাগ্য দান করেন আমিন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker