Barak UpdatesHappeningsBreaking NewsFeature Story

একুশে ফেব্রুয়ারির ভাবনা, লিখেছেন সঞ্জীব দেব লস্কর

// সঞ্জীব দেব লস্কর//

একুশে ফেব্রুয়ারি আধুনিক বিশ্বে এক উদার সমাজ নির্মাণের ইস্তেহার।

এ দিনটি কেবল একটি স্মৃতির দিন নয়, এটি একটি দার্শনিক অবস্থানও বটে। মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে মানুষের আত্মমর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বোধ ও সাংস্কৃতিক সহাবস্থানের যে ধারণা—তার প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ এই একুশেতেই স্পষ্ট হয়েছিল। সেই অর্থে একুশে ফেব্রুয়ারি হল আধুনিক পৃথিবীকে বাঙালির এক অনন্য উপহার—যে উপহার মানবসভ্যতাকে শিখিয়েছে রাষ্ট্রের চেয়েও ভাষা বড়, ধর্মের চেয়ে মাতৃভাষা বড় এবং ক্ষমতার চেয়ে বড় মানুষের কণ্ঠস্বর।

মাতৃভাষা মানে শুধু কিছু শব্দ উচ্চারণ নয়; এ হল মানুষের চিন্তার গঠন, সংবেদনশীলতার বিকাশ এবং ভিন্নমতকে সহ্য করার মানসিক প্রশিক্ষণ। যে সমাজ তার মাতৃভাষাকে ভিতর থেকে জানে, অন্তর দিয়ে বোঝে এবং সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করতে শেখে — সে সমাজ নিজ দেশ–এর জল মাটি, আলো হাওয়া ঘাস পাতা ধুলো জোছনাকেও ভালোবাসতে জানে; এবং সে সমাজ যদি হয় বহুভাষিক, বহুসাংস্কৃতিক সমাজ তবে এ বাস্তবতাকেও শ্রদ্ধা করতে শেখে। মাতৃভাষার ভিতর দিয়েই মানুষ প্রথম ‘অপর’-কে চিনতে শেখে—এবং এ পথ ধরে ভিন্ন উচ্চারণ, ভিন্ন শব্দ, ভিন্ন অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। এই জন্যই ভাষার প্রতি ভালবাসা একটি উদার ও সমন্বিত সমাজ নির্মাণের প্রাথমিক শর্ত। যারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে না এদের কাছে বিশ্বমাতৃভাষা দিবসের কোন আবেদন পৌঁছোতে পারে না।

আজ আমাদের এ উপমহাদেশে ভাষিক আধিপত্যবাদ, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, নির্লজ্জ ধর্মান্ধতার আগ্রাসন এবং এরই হাত ধরে মাতৃভাষার উপর আগ্রাসন প্রবল হয়ে উঠছে। রাষ্ট্রীয় মদতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে পদানত করার প্রবণতাও প্রবল হয়ে উঠছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে ফ্যাসিবাদের আত্মপ্রকাশ অবধারিত। যেখানে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষাকে হেয় করা হয়, সেখানে মানুষের সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসকেও ভেঙে দেওয়া হয়। এই ভাঙন থেকেই জন্ম নেয় একরৈখিক জাতীয়তাবাদ—যা ধর্মকে ঢাল করে ভাষিক বৈচিত্র্যকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে, যেমন আমাদের দেশে হয়েছে।

বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিসত্তার ক্ষেত্রে বিপদ আজ গভীর। কারণ ঐতিহাসিকভাবে বাঙালির জাতিগত পরিচয় ভাষাভিত্তিক—ধর্মভিত্তিক নয়। ভাষিক জাতীয়তাবাদের এই ঐতিহ্যই একাত্তরে উগ্র ধর্মীয় রাষ্ট্রের বুকের ভিতর জন্ম দিয়েছিল ধর্ম-নিরপেক্ষ ভাষিক চেতনা, সম্ভব করেছিল মুক্তিযুদ্ধ, এবং পরিণামে সাহিত্য-সংস্কৃতিকে দিয়েছিল এক বৈশ্বিক মর্যাদা, যাকে ধ্বংস করার এত আয়োজন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। ভয়ঙ্কর প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ভাষিক জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকার বহন করেছেন যুক্তিবাদী শহিদ অভিজিৎ রায়, তাঁর সহযোগী রায়হান আবীর, ‘একাত্তরের জিসু’র কথক, জেলে অত্যাচারিত অশীতিপর বৃদ্ধ শাহরিয়ার কবির, ‘জোছনা ও জননী’, ‘আগুনের পরশমণি’ খ্যাত কথাকার হুমায়ূন আহমেদ, উগ্র ধর্মীয়জাতীয়বাদ বিরোধী ভাষাতাত্ত্বিক হুমায়ূন আজাদ, মুক্তমনা ব্যাকরণবিদ, রফিকুল ইসলাম, ঔপন্যাসিক সেলিনা হোসেন, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল/ সকলেই বলে বিচার চাই,/ মুজিব হত্যার বিচার চাই’ বলে রাজপথে দাঁড়ানো নিরস্ত্র কবি নির্মলেন্দু গুণ, রবীন্দ্রসংগীত সম্বল করে ‘ছায়ানট’এর সনজিদা খাতুন, প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, সিলেটের উদীচী। এরাই একুশের বাংলার মুখ—এ মুখ যারা দেখেছেন এদের আর পৃথিবীর রূপ খুঁজতে যাবার প্রয়োজন নেই যেমন বলেছেন রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, যখনই এ উপমহাদেশে ভাষার প্রশ্নে আপস করতে বলা হয়, ধর্মীয় পরিচয়কে ভাষার উপরে বসানো হয়—তখন বাংলা ভাষাই শুধু দুর্বল হয় না, পুরো একটি জনগোষ্ঠীও দীর্ঘমেয়াদে কোণঠাসা হয়ে পড়ে—। এই সেদিনের অর্থাৎ সাম্প্রতিক অতীতে একুশের সামনে এ প্রত্যাহ্বান কেবলমাত্র বাংলাদেশের জন্যই নয় গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের জন্যও এক অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছিল। একুশ চর্চা তাই কোনো একদিবসীয় নস্টালজিক বিলাস নয়। এটি একটি সর্বকালীন নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব। আমাদের উনিশের ভূমিতেও বাংলা এবং প্রতিবেশী ডিমাসা, মিথেই, নেপালি, চা বাগানীয়া এবং বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করার পক্ষে দাঁড়ানো মানে ক্রমবর্ধমান গরিষ্ঠতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে এক উদারনৈতিক মানবিক বোধকে শক্তিশালী করা।

ভাষার পীড়নে আক্রান্ত আসাম রাজ্যে চলমান আন্দোলন কেবলমাত্র একটি ভাষাকে বাঁচানোর নয়—দেশের প্রান্তিক বাস্তুহারা অর্ধশিক্ষিত নিরক্ষর নাগরিক আধানাগরিকদের নিয়ে একটি উদার, সংযুক্ত ও মানবিক সমাজকে বাঁচিয়ে রাখারই আন্দোলন। এই ক’দিন আগেই মনে হয়েছিল বাঙালি বুঝি একুশকে প্রত্যাখ্যানের পথে বেশ দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলছে। কিন্তু একুশের দর্শন প্রবল ধর্মীয় হানাহানি, সংখ্যালঘু নিপীড়নে হারিয়ে যায়নি। ওপারে এবং এপারে শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জনগণ প্রমাণ করে দিয়েছেন একুশের ডাক অখণ্ড মানবিক জাতিচেতনার ডাক, কোন হিংসার আহ্বান নয়। এবারের একুশের প্রেক্ষিত আবার মনে করিয়ে দিল—দিনটি কেবল একদিনের উচ্ছ্বাসে আর উদযাপনে নয়, প্রাত্যহিক দায়িত্বেও। মৌলবাদী ধর্মীয়রাষ্ট্রবাদ পরাভূত হয়ে একুশের উৎসভূমিতে এবং এপারে আমাদের পঞ্চদশ শহিদের ভূমিতেও একুশের দর্শন দৃঢ় ভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করুক—এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা। বাংলা ভাষা, বাঙালি সত্তা এবং অখণ্ড বাঙালিচেতনা এই পুরো ভারতীয় উপমহাদেশে স্বীকৃতি ও মর্যাদা লাভ করুক। আমাদের মাতৃভাষাকে দুর্বল করে, আমাদের সংস্কৃতিকে খণ্ডিত করে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন, একাকী করে দেওয়ার যে প্রক্রিয়া আজ অগ্রগতি লাভ করেছে—তা প্রতিহত করতে না পারলে বাঙালিজাতি witch hunting-এর শিকার হতেই থাকবে—দিল্লি থেকে আসাম, মেঘালয় থেকে মিজোরাম, তিনসুকিয়ার ধলা সদিয়া, জিরিবামের জাউকরাডহর থেকে বরাকের হাইলাকান্দি পর্যন্ত।

একুশ তাই আর কেবল একটি স্মরণের দিন নয়, অবদমিত ক্ষুদ্র মাঝারি জনগোষ্ঠীর আত্মরক্ষার শপথের দিনও বটে। এই শপথ ভাঙলে ইতিহাস শুধু আমাদের নয় আমাদের প্রতিবেশী ভিন্নভাষী জনগোষ্ঠীকেও ক্ষমা করবে না।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker