Barak UpdatesHappeningsBreaking News

সরা চিত্রের নবজাগরণে শিল্পাঙ্গনের রজতজয়ন্তী বর্ষে কর্মশালা

ওয়েটুবরাক, ১২ নভেম্বর: বরাক উপত্যকার অন্যতম শিল্প ও কারুশিল্প প্রতিষ্ঠান ‘শিল্পাঙ্গন’ তাদের রজতজয়ন্তীর বর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে আয়োজন করে দু’দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী সরা চিত্র বিষয়ক কর্মশালা। যার সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল টিচার্স টেনিং কলেজ, শিলচর এবং সেন্টার ফর ইন্ডিয়ান নলেজ সিস্টেম, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়। এই কর্মশালায় সহযোগিতায় ছিল প্রবালিনী আর্ট ফাউডেশন।

গত ১ এবং ২ নভেম্বর শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিচার্স টেনিং কলেজ) অডিটোরিয়ামে প্রশান্ত শীল স্মৃতি মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এই কর্মশালা। কর্মশালার উদ্বোধন করেন রাজ্যসভার সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ। উপস্থিত ছিলেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. নির্মলকান্তি রায়, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষা অপর্ণা ভট্টাচার্য এবং রজতজয়ন্তী বর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতি নীহাররঞ্জন পাল। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সূচনা হয় প্রদীপ প্রজ্বলন ও সঙ্গীত পরিবেশন দিয়ে। সঙ্গীত পরিবেশন করেন কলেজের শিক্ষক ও প্রশিক্ষণ প্রার্থীরা।

এই কর্মশালায় রিসোর্স পার্সন হিসেবে ছিলেন কাছাড়ের পানিভরার খ্যাতনামা মৃৎশিল্পী গান্ধী পাল ও বাপন পাল। এ ছাড়াও সংস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত শীলের অকালপ্রয়াণে শোক প্রকাশ করে তাঁর স্মৃতিতে উৎসর্গ করা হয় মঞ্চ। স্বাগত বক্তব্যে সরাচিত্রের ইতিবৃত্ত তুলে ধরেন কর্মশালা আয়োজন কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. পিণাকপানি নাথ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সাংসদ কণাদ পুরকায়স্থ বলেন, দেশকে আত্মনির্ভর করতে স্থানীয় শিল্পীকে উৎসাহিত করতে হবে। স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন বাড়াতে হবে। স্থানীয় শিল্প কিনতে এগিয়ে আসতে হবে সাধারণ মানুষকে। ব্যবস্থা করতে হবে বিপণনের। তবেই প্রধানমন্ত্রীর ‘ভোকাল ফর লোকাল’ নীতির সঠিক বাস্তবায়ন হবে। শিল্পাঙ্গনের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি।

অধ্যাপক নির্মলকান্তি রায় বলেন, সরাচিত্র অতি প্রাচীন একটি শিল্পকলা। যা সময়ের সঙ্গে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। বাঁচিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব হলেও আমরা সঠিকভাবে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে পারছি-না। এ জন্যই গোটা মৃৎশিল্প বর্তমানে সংকটে রয়েছে। তিনি বলেন, প্রশান্ত শীল বরাক উপত্যকার একজন নামি শিল্পী ছিলেন। শিল্প নিয়ে পড়াশোনা করেছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, দিল্লিতে গিয়ে শিল্পক্ষেত্রে বড় জায়গায় সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন। একইসঙ্গে শিলচরে থাকাকালীন তাঁর উৎসাহেই গড়ে ওঠে শিল্পাঙ্গন। প্রশান্ত স্বপ্ন দেখতেন বরাকের শিল্পকে দেশের মানচিত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার। এই বিষয়টি মাথায় রেখে তিনি নিজেও বহুদিন কাজ করেছেন। এখন সেই স্বপ্ন আমাদের। বাস্তবায়িত করতে হবে তাঁর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে।

অনুষ্ঠানে এছাড়াও বক্তব্য রাখেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষা অপর্ণা ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে পৌরোহিতা করেন শিল্পাঙ্গনের রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটির সভাপতি নীহাররঞ্জন পাল। রজতজয়ন্তী উপলক্ষে প্রশান্ত শীলের স্মৃতিতে গত ১৪ আগস্ট অনলাইনে অঙ্কন প্রতিযেগিতার আয়োজন করা হয়েছিল শিল্পাঙ্গনের উদ্যোগে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজয়ী প্রতিযোগীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন অতিথিরা।

কর্মশালায় প্রশিক্ষণের দায়িত্বে থাকা গান্ধী পাল ও বাপন পালকে এ অনুষ্ঠানে সম্মাননা জানানো হয়। তাছাড়া অতিথি হিসেবে বরাক উপত্যকার প্রবীণ শিল্পী ও আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতায় এই কর্মশালা সাফল্যমন্ডিত হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন প্রতীতি শীল ও পৌলমী শীল।

দু’দিনের এ অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ ২ নভেম্বর প্রধান অতিথি হিসেবে হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গুরুচরণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর নিরঞ্জন রায়, আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ড. প্রদোষকিরণ নাথ, কাছাড় কলেজের অধ্যক্ষ ড. অপ্রতিম নাগ, রোজকান্দি চা বাগানের ডিরেক্টর ঈশ্বরভাই ওয়াদিয়া, টিচার্স ট্রেনিং কলেজের অধ্যক্ষা অপর্ণা ভট্টাচার্য, রজতজয়ন্তী উদযাপন সমিতির সভাপতি নীহাররঞ্জন পাল। তাছাড়াও আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজকুমার মজিন্দার।

অধ্যাপক রাজকুমার মজিন্দার প্রচলিত সরা ও সমসাময়িক সরা কীভাবে হয় তা নিয়ে বক্তব্য রাখেন। উপাচার্য নিরঞ্জন রায় বলেন, কুটিরশিল্প ও সরার ভূমিকা কী, নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছলে কী লাভ হয়, তাছাড়া আমাদের দেশের অর্থনীতি আগে কী ছিল, বর্তমানে কী আছে, ভবিষ্যতে কী হবে, ২০৪০ থেকে ২০৪৭ বর্ষে আমাদের দেশ যে বিশ্বগুরু হবে সেটা নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

ঈশ্বরভাই ওয়াদিয়া শিল্পাঙ্গনের কর্মশালাকে সাধুবাদ জানান এবং এ ধরনের আরও অনুষ্ঠানে তিনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন। তাছাড়া আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক ড. প্রদোষকিরণ নাথ ও কাছাড় কলেজের অধ্যক্ষ অপ্রতিম নাগ শিল্পাঙ্গনের ভূয়সী প্রশংসা করে কাজের জন্য উৎসাহিত করেন।

কর্মশালায় মোট ৮০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে ৫০জন ছিলেন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী এবং বাকিরা ছিলেন শিলচর ও আশেপাশের স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী। এই কর্মশালাকে সাফল্যমণ্ডিত করতে বরাক উপত্যকার খ্যাতনামা শিল্পীরা, আসাম বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা বিভাগের প্রাক্তনীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চিত্রশিল্পী বিমলেন্দু সিনহা, অরুণকুমার পাল, বাহারুল ইসলাম লস্কর, অজয় দে, উত্তম ঘোষ, জয়দীপ ভট্টাচার্য, অজন্তা দাস, হ‌্যাপি দে, রাজলক্ষী ভট্টাচার্য, স্বপনকান্তি কর, ড. নিপ্পন দাস প্রমুখ।

গান্ধী পাল ও বাপন পালের সহযোগিতায় ও অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপক আগ্রহ ও উপস্থিতির ফলে কর্মশালাটি পরিপূর্ণ সাফল্যমণ্ডিত হয়ে ওঠে। এই কর্মশালায় সার্বিক পরিকল্পনায় ছিলেন রজতজয়ন্তী উদযাপন সমিতির সাধারণ সম্পাদক তথা শিল্পাঙ্গনের অধ্যক্ষ সন্দীপন দত্ত পুরকায়স্থ এবং এই কর্মশালার যুগ্ম আহ্বায়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রভাষক ড. পিণাকপানি নাথ ও ড. বিনয় পাল।

কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথিদের দ্বারা প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে প্রশংসাপত্র প্রদান করা হয়। অধ্যক্ষা অপর্ণা ভট্টাচার্য বলেন, এই কর্মশালাটি শিল্প ও শিক্ষার মেলবন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ। শিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থীদের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে বাস্তর সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করার জন্য প্রশংসা করেন। রজত জয়ন্তী উদযাপন সমিতির সভাপতি নীহাররঞ্জন পাল শিল্পাঙ্গনকে সাধুবাদ, শুভকামনা জানিয়ে কর্মশালাটির সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

কর্মশালাটি সবার সহযোগিতায় ও অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপক আগ্রহ ও উপস্থিতির ফলে পরিপূর্ণ সাফল্য অর্জন করে এবং বিভিন্ন মহলের প্রশংসা লাভ করে।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker