Barak UpdatesHappeningsBreaking News
মাধ্যমিকের সমাজবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে বাংলার নামে এ কোন ভাষা?
ছাপার ভুল, অসমিয়া শব্দের ব্যবহার, বহু প্রশ্নে বাক্যই হয়নি

ওয়েটুবরাক, ১৬ ফেব্রুয়ারিঃ মাধ্যমিক তথা এইচএসএলসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাংলাভাষার নামে কোন ভাষা যে ব্যবহৃত হলো, পরীক্ষার্থীদের এটিই বড় জিজ্ঞাসা। শুক্রবার সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি ভাষানীতি মেনেই ইংরেজির পাশাপাশি প্রশ্ন ছাপা হয়েছে অসমিয়া, বাংলা, বড়ো এবং হিন্দিতে। কিন্তু বাংলায় যে সমাজবিজ্ঞানের প্রশ্ন করা হয়েছে, সেগুলি কি আদৌ বাংলা ভাষায় হয়েছে? দুর্বোধ্য ভাষা ব্যবহারের ফলে বাংলা মাধ্যমের পরীক্ষার্থীরা অনেকগুলো প্রশ্ন বুঝতেই পারেনি, ফলে উত্তর জানা থাকলেও লিখতে পারেনি। এর দায় কে নেবে? এর জবাব খুঁজছেন বাংলা মাধ্যমের পরীক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা।
বাংলাভাষায় মুদ্রিত সমাজবিজ্ঞান প্রশ্নপত্রের ৩ নং প্রশ্নে ‘খসড়া কমিটি’কে লেখা হয়েছে ‘খচরা কমিটি’। ৯ নং প্রশ্নে ভারতবর্ষে কাগজি মুদ্রা কে ছাপায়, এ ভাবে না লিখে লেখা হয়েছে, ভারতবর্ষে কাগজি মুদ্রা কে ছাপিয়েছিল? ১১ ও ১৪ নং প্রশ্নে বঙ্গকে ছাপানো হয়েছে বংগ। প্রত্যাহ্বানের হয়েছে ‘প্রত্যাভাণের। ১৬ নং প্রশ্নে শনাক্ত করো লেখা হয়েছে চিনাক্ত করো। এগুলিকে বিভ্রান্তিকর বলেই উল্লেখ করছেন অভিভাবকরা।
কয়েকটি প্রশ্ন বোঝা একেবারেই কঠিন ছিল। ৭নং প্রশ্নটি এসেছে এরকম, দেশের মোট জাতীয় আয়ের মোট জনসংখ্যাকে হরণ করলে আমরা পাই (এ) প্রত্যাশিত আয়ুস (বি) মানব উন্নয়ন সূচাংক (সি) জনমূরি আয় (ডি) মোট ঘরোয়া উৎপাদন।
বোঝা গেল কিছু? ইংরেজি প্রশ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়, প্রশ্নকর্তা বলতে চেয়েছেন, দেশের মোট জাতীয় আয়কে দেশের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে আমরা পাই (এ) প্রত্যাশিত আয়ু (বি) মানব উন্নয়ন সূচাংক (সি) মাথপিছু আয় (ডি) মোট ঘরোয়া উৎপাদন। প্রশ্নের অনুবাদ তো হয়ইনি, সেইসঙ্গে মাথাপিছু আয়ের জায়গায় লেখা হয়েছে জনমূরি আয়। প্রত্যাশিত আয়ুর স্থলে প্রত্যাশিত আয়ুস।
১৭ নং প্রশ্নটি হলো, ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে সময়ে হওয়া ব্রিটিশ বিরোধী জাগরণের প্রধান কারণ কি ছিল? একে তো অনুবাদক কি (ক ই-কার) এবং কী (ক ঈ-কার) কখন কেন ব্যবহার হয়, সেটাই জানেন না। দ্বিতীয়ত, প্রারম্ভে সময়ে হওয়া বলতে কী বোঝাতে চাইলেন? ২০ নং প্রশ্নটি আরও বিভ্রান্তিকর। লেখা হয়েছে, নিম্নলিখিত ঐতিহাসিক পরিঘটনাসমূহর ক্রমেরথেকে পুরোনোর থেকে নতুনভাবে সাজিয়ে সঠিক ক্রমের বিকল্পটি বেছে বার করো। চল্লিশবার পড়েও ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে কি বোঝা সম্ভব, আসলে প্রশ্নটি কী। ইংরেজিতে লেখা রয়েছে, ফাইন্ড আউট দ্য কারেক্ট অপশন ফ্রম দ্য ফলোয়িং সিকোয়েন্সেস অব হিস্টোরিক্যাল ইভেন্টস ইন দ্য অর্ডার অব ওল্ড টু নিউ।
২৩ নং প্রশ্নে চারটি উত্তর দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, নিম্নলিখিত কোনটি সঠিকভাবে মিলে আছে। কী ধরনের বাংলা এগুলো? ৩৪ নং প্রশ্নও তথৈবচ। লেখা হয়েছে, নিম্নলিখিত কোন জোড়াটি শুদ্ধভাবে মিলে আছে। ৪০ নং প্রশ্নটি হলো, নীচে দেয়াগুলো মেলাও এবং শুদ্ধ উত্তরটি বেছে বার করো। ২৯ নং প্রশ্নে ছাপা হয়েছে, নীচের দেখাগুলো মেলাও। ৪৫ নং প্রশ্নে জনগণনাকে লেখা হয়েছে লোকপিয়ল।
এইসব কারণে শুক্রবার পরীক্ষার হলে বসে ছাত্রছাত্রীদের প্রশ্ন বুঝতে গিয়েই বহু সময় চলে গিয়েছে। অনেক ছাত্র ওইসব প্রশ্নে আসলে কী জানতে চাওয়া হয়েছে, তা শেষপর্যন্ত বুঝতেই পারেনি।
৪৭ নং প্রশ্নটি দেখলে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার চরম অবনমনটি টের পাওয়া যায়। প্রশ্নটি হুবহু এরকম, ‘‘আমাকে রক্ত দাও এবং আমি তোমাদের স্বাধীনতা দিব’’ — এই উক্তিটির পরিপেক্ষিতে রক্ত শব্দটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো এবং এই কথাটি কে বলেছিল? একে তো উদ্ধৃতিটিই ভুল, দ্বিতীয়ত পরিপ্রেক্ষিতে বানান ভুল এবং সবচেয়ে আপত্তিকর হলো, মনীষীদের কথায় যে বলেছিলেন লিখতে হয়, তাও মূল প্রশ্নের অনুবাদক জানেন না।
৫০ নং প্রশ্নটিতে সমাজবিজ্ঞানের স্থলে ছাপা হয়েছে সমানবিজ্ঞানের, লিখলো-কে শিখলো। ৫২ নং প্রশ্নে অনবীকরণযোগ্যকে লেখা হয়েছে অনবীকরণযোগ, কেন বানানটি হয়েছে কেনো।
এক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে যদি এত ভুল, তবে পরীক্ষার্থীরা কত নম্বরের উত্তর করতে সক্ষম হবে? পরীক্ষার হলে বসে প্রশ্নটা আসলে কী, সেটা চিন্তা করবে, নাকি তারা উত্তর নিয়ে ভাববে?
জনমূরি আয়, লোকপিয়ল, চিনাক্ত ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার দেখে ছাত্রছাত্রী-অভিভাবকদের জিজ্ঞাসা, প্রশ্নের অনুবাদটা কি আদৌ বাংলা মাধ্যমের শিক্ষকদের দিয়েই করানো হয়েছিল? বাংলা মাধ্যমে মাধ্যমিকের প্রশ্ন অনুবাদ করার মতো শিক্ষক কি নেই? আর যিনিই অনুবাদ করুন, ছাপানোর আগে তা দেখার জন্য কি কোনও ব্যবস্থা নেই? নাকি বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা-অবহেলা থেকেই এইসব করা?



