Barak UpdatesHappeningsBreaking News

ন্যায়বিচারের দূরত্ব কি চিরস্থায়ী, বরাকের প্রশ্নে উত্তর মেলেনি আজও, লিখেছেন ধর্মানন্দ দেব

//ধর্মানন্দ দেব//

ইতিহাস সব সময় রাজ্যপালদের আদেশ, রাষ্ট্রপতির বিজ্ঞপ্তি বা সরকারি ফাইলের ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করে না। অনেক ইতিহাস লেখা থাকে মানুষের মনে, জীবনের অভিজ্ঞতায়, দীর্ঘদিন ধরে জমে ওঠা বঞ্চনার স্মৃতিতে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যে অপেক্ষা বহন করা হয়, যে প্রশ্ন বারবার উচ্চারিত হয় অথচ উত্তর মেলে না—সেই প্রশ্নই একদিন ইতিহাসের ভাষা হয়ে ওঠে। জলপাইগুড়িতে কলকাতা হাইকোর্টের সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা সেই রকমই এক ইতিহাস, যা কেবল একটি বিচারালয় স্থাপনের ঘটনা নয়; এটি ন্যায়বিচারকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনার এক দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতি।

 

স্বাধীনতার পরপরই ভারতের সংবিধান নাগরিকদের জন্য ন্যায়বিচারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব জীবনে এই অধিকার কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে বিচারব্যবস্থার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রাপ্যতার উপর। উত্তরবঙ্গের মানুষ ষাটের দশকেই বুঝে ফেলেছিলেন, ন্যায়বিচার যদি কয়েকশ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে, তবে সেই অধিকার কাগজে-কলমে যত শক্তিশালীই হোক, সাধারণ মানুষের জীবনে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, দার্জিলিং কিংবা আলিপুরদুয়ারের মানুষের কাছে তখন কলকাতায় হাইকোর্টে যাওয়া মানেই দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল যাত্রা, কর্মজীবনের ক্ষতি এবং মানসিক চাপের এক অবিরাম চক্র।

 

এই বাস্তবতা থেকেই উত্তরবঙ্গের আইনজীবীরা প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন সার্কিট বেঞ্চের দাবি। তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন, এটি কেবল পেশাগত সুবিধার প্রশ্ন নয়; এটি সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১–এ নিহিত জীবনের অধিকার ও ন্যায়বিচারে সহজ প্রবেশাধিকারের প্রশ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উপলব্ধি সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ে। আশির দশকের শেষভাগে এই আন্দোলন আর শুধু আদালতের করিডোরে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তা ছড়িয়ে পড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, গ্রাম ও শহরের রাজপথে। শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও ছাত্রসমাজ বুঝে নিয়েছিলেন—ন্যায়বিচার দূরে থাকলে সমাজে প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

 

দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই এই দাবি সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়। বিচারপতিদের কমিশন উত্তরবঙ্গ পরিদর্শন করে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এবং স্পষ্টভাবে সার্কিট বেঞ্চ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে। সর্বোচ্চ আদালতের অনুমোদন সত্ত্বেও প্রশাসনিক গড়িমসির কারণে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়, কিন্তু আন্দোলন থেমে থাকেনি। অবশেষে রাষ্ট্রপতির আদেশে জলপাইগুড়িতে সার্কিট বেঞ্চ প্রতিষ্ঠা হয় এবং স্থায়ী ভবনের মাধ্যমে সেই সিদ্ধান্ত স্থায়িত্ব পায়। এই অর্জন প্রমাণ করে—সংগঠিত ও শান্তিপূর্ণ সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রকেও তার দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়।

 

এই প্রেক্ষাপটেই বরাক উপত্যকার মানুষের প্রশ্ন আরও তীব্র হয়ে ওঠে। কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দির মানুষ আজও ন্যায়বিচারের জন্য গুয়াহাটির উপর নির্ভরশীল। শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আদালতে হাজির হওয়া এখানে নিত্যদিনের বাস্তবতা। এই দূরত্ব শুধু ভৌগোলিক নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অর্থনৈতিক ব্যয়, সময়ের অপচয় এবং মানসিক অবসাদ। অনেক দরিদ্র মানুষ এই ব্যয় বহন করতে না পেরে আইনি লড়াই শুরু করার আগেই পিছিয়ে যান। ফলে ন্যায়বিচার তাদের কাছে অধিকার নয়, প্রায় অসম্ভব এক স্বপ্নে পরিণত হয়।

বরাক উপত্যকার বাস্তবতায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যুক্ত হয়েছে ভাষার প্রশ্ন। এখানকার মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, অথচ বিচার প্রক্রিয়ার পরিসরে ভাষাগত দূরত্ব অনেক সময় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণকে সীমিত করে তোলে। ন্যায়বিচার তখন কেবল আইনি প্রক্রিয়া নয়, এক মানসিক বাধাও হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়ায় বিকেন্দ্রীকরণ বরাকের জন্য শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন।

 

এ কথা ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, বরাক উপত্যকা কোনও বিচ্ছিন্ন বা গুরুত্বহীন অঞ্চল নয়। প্রশাসনিক ও উন্নয়নমূলক ক্ষেত্রে বরাকের জন্য পৃথক কাঠামো ইতিমধ্যেই গড়ে উঠেছে। যখন উন্নয়নের স্বার্থে বিকেন্দ্রীকরণ সম্ভব হয়েছে, তখন ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেই বা তা অসম্ভব হবে কেন? সংবিধান কোথাও বিচার প্রক্রিয়ার বিকেন্দ্রীকরণকে নিষিদ্ধ করেনি; বরং নাগরিকের সুবিধা ও ন্যায়বিচারের সহজ প্রবেশাধিকারের কথা মাথায় রেখেই এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ রেখেছে।

 

বরাকের একজন কৃষক যখন জমি সংক্রান্ত বিরোধে আদালতের দ্বারস্থ হন, একজন শ্রমিক যখন ন্যায্য মজুরির দাবিতে মামলা করেন, কিংবা একজন অভিভাবক যখন সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষায় আইনি আশ্রয় চান—তখন তাদের প্রত্যেকের যাত্রা একই রকম কষ্টের। গুয়াহাটির পথে সেই যাত্রা কেবল দূরত্ব অতিক্রম নয়; এটি ক্লান্ত শরীর, অনিশ্চিত অর্থব্যয় ও দীর্ঘসূত্রিতার সঙ্গে এক অসম লড়াই। অনেক সময় এই লড়াই মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যায়, আর ন্যায়বিচার তখন অধিকার থেকে সরে গিয়ে বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্নদের নাগালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

 

এই বাস্তবতা আজ বরাক উপত্যকার মানুষের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে। কবে এই অঞ্চল ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠে ন্যায়বিচারের দাবি তুলবে? কবে এই দীর্ঘ নীরবতা সংগঠিত আন্দোলনের ভাষা পাবে? জলপাইগুড়ির ইতিহাস আমাদের শেখায়—ন্যায়বিচার কখনও দয়া হিসেবে আসে না; তা অর্জন করতে হয় ধারাবাহিক ও দৃঢ় সংগ্রামের মাধ্যমে। উত্তরবঙ্গের মানুষ অপেক্ষাকে দাবিতে রূপান্তর করেছিলেন বলেই আজ তারা ন্যায়বিচারকে নিজেদের দোরগোড়ায় এনে দাঁড় করাতে পেরেছেন।

 

আজ উত্তরবঙ্গের আকাশে নতুন দিনের আলো ফুটেছে। আদালত আর মানুষের জীবনের মাঝখানে থাকা দূরত্ব কমেছে, কষ্টের প্রাচীর ভেঙে পড়েছে। কিন্তু বরাক উপত্যকায় সেই আলো এখনও পুরোপুরি পৌঁছায়নি। এখানকার মানুষের চোখে আজও জমে থাকে নীরব প্রশ্ন—আমাদের জন্য কি শুধু অপেক্ষাই নির্ধারিত?

 

এই প্রশ্নের উত্তর কোনও একক প্রশাসনিক আদেশে সীমাবদ্ধ নয়। এই উত্তর লুকিয়ে আছে বরাক উপত্যকার মানুষের ঐক্য, সচেতনতা ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে। সময় এসেছে এই অঞ্চলের মানুষকে নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে এক কণ্ঠে কথা বলার। ন্যায়বিচার কারও দয়া নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। উত্তরবঙ্গের চোখের জল আজ শুকিয়েছে—এবার সময় এসেছে বরাকের মানুষের চোখের জল শুকানোর।

    (লেখক পেশায় আইনজীবী)

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!
Close
Close

Adblock Detected

Please consider supporting us by disabling your ad blocker