Barak UpdatesAnalyticsBreaking News
কবীন্দ্র পুরকায়স্থ : জীবনের এক দীর্ঘ পরিক্রমা

ওয়ে টু বরাক, ৭ জানুয়ারি : বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কবীন্দ্র পুরকায়স্থের জীবন এক দীর্ঘ পরিক্রমা। অবিভক্ত ভারতের সিলেট থেকে বর্তমান ভারতের শিলচর পর্যন্ত এই যাত্রায় তিনি এক ঊজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। তাঁর জন্ম তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের সিলেট জেলার কামারখালে ১৫ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে। বাবা প্রয়াত কালীপদ পুরকায়স্থ ও মা প্রয়াত সর্বমঙ্গলা দেবী।
কবীন্দ্র বাবুর প্রাথমিক শিক্ষা কামারখালে, এরপর পড়তে যান সুনামগঞ্জে। সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণিতে বৃত্তি পেয়ে পড়তে আসেন উধারবন্দের ডিএন হাই স্কুলে। ওই স্কুল থেকে প্রথম ব্যাচের মেট্রিক পরীক্ষার্থী হিসেবে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন তিনি। স্বাধীনতার পূর্বেই কাছাড়ে তাঁর পুরো পরিবার এসে বসতি স্থাপন করেন। মেট্রিক পাশের পর ক্রমপর্যায়ে স্নাতক, বিটি ও গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর (বাংলা) ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫০-৫১ সাল থেকে কাছাড়ে উদ্বাস্তুদের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের কাজে ঝাপিয়ে পড়েন। রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘে যোগদান করেন প্রচারক বসন্ত লক্সমন ফাডনিস্ এর আহ্বানে ১৯৫০ সালে। তারপর সংঘের বিভিন্ন দায়িত্ব প্রচারক হয়ে সম্পাদন করেন। বরাক উপত্যকা, ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা, ত্রিপুরা, মনিপুর সহ উত্তরপূর্বাঞ্চলে সংঘের বিস্তারের লক্ষ্যে কাজ করেন। একজন শিক্ষক হয়ে স্থানীয় নরসিং এইচএস স্কুলে যোগদান করেন। অধ্যক্ষ হন রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠের (রামকৃষ্ণনগর)। সেই সময় ( ‘৬০-‘৭০ দশকে) এক জন শিক্ষক নেতা হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। শিক্ষক সংস্থার বিভিন্ন পদে থেকে শিক্ষকদের বিভিন্ন ন্যায্য দাবি আদায়ে মুখর হন।
এ দিকে এক সাথেই আর এস এসের কাজ করতে থাকেন। তখনকার সময়ের সংঘের জাতীয়স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলে উত্তরপূর্বাঞ্চলে কাজ করতে থাকেন। গুরুজী গোলওয়াকর থেকে শুরু করে বালাসাহেব দেওরস, একনাথ রাণাডে, দীনদয়াল উপাধ্যায়, অটল বিহারী বাজপেয়ী, কুশাভাউ ঠাকরে, লালকৃষ্ণ আডবানি, রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়া প্রমুখের সাথে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালে অধ্যক্ষ থাকাকালীন সংঘের নির্দেশে চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৮ সালে সে সময়ের জনতা পার্টির আসাম প্রদেশের সাধারণ সম্পাদক পদ লাভ করেন ও বিধানসভা নির্বাচনে শিলচর কেন্দ্র থেকে প্রতিযোগিতা করেন।
জনতা পার্টি ভেঙে যাওয়ায় ১৯৮০ সালে এপ্রিল মাসে জন্ম নেয় ভারতীয় জনতা পার্টি আর কবীন্দ্র পুরকায়স্থ ছিলেন অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। সভাপতি অটল বিহারী বাজপেয়ীর নির্দেশে আসাম তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলে দল গঠন ও বিস্তারের জন্য কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে আহ্বায়কের দায়িত্ব দেন ও সেই দায়িত্ব পেয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে দলের সাংগঠনিক বিস্তার করেন আসাম তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলে। ১৯৮৬ সালে আবার আসাম বিধানসভায় শিলচর কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, যদিও তারই ছাত্র কংগ্রেসের কর্ণেন্দু ভট্টাচার্যের কাছে হেরে যান। সংগঠন বিস্তারের কাজে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে জড়িত রেখেও সে সময় (‘৮০ দশক) শিলচরের দেউলিয়া হয়ে যাওয়া আরবান কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কের চেয়ারম্যান হয়ে অল্পদিনের মধ্যেই ব্যাঙ্কটির হাল ফেরাতে সফল হন।
১৯৯১ সালে শিলচর লোকসভা নির্বাচনে দাঁড়িয়ে জয়ী হন। সেই সংগে বরাক উপত্যকায় ৯টি বিধানসভা আসনে জয়ী হয় বিজেপি, অবশ্যই কবীন্দ্র পুরকায়স্থের নেতৃত্বে। তিনি লোকসভা নির্বাচনে অংশ নেন ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯ ও ২০১৪ সালে। জেতেন ১৯৯১, ১৯৯৮ ও ২০০৯ সালে।
১৯৯৮ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসায় কবীন্দ্র পুরকায়স্থকে মন্ত্রী করেন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী। দায়িত্ব পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রকের। সে সময় তাঁর নেতৃত্বেই মাত্র ১৩ মাসে মন্ত্রীত্বকালে সারা দেশের সঙ্গে উত্তর পূর্বাঞ্চলে টেলিযোগাযোগ ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতি লাভ করে। মন্ত্রী থাকাকালীন তিনি আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা ড. কেশব বলিরাম হেডগাওয়ার ও জননেতা অরুন কুমার চন্দের ছবি সম্বলিত ডাক টিকিট, ফার্স্ট ডে কভার বের করেন। দেশের নেতৃত্ব দেন বিদেশে বিভিন্ন সরকারি কার্যক্রমে। আমেরিকা, চীন, গ্রেট ব্রিটেন, কেনিয়া, সুইজারল্যান্ড, বাংলাদেশ, মরিশাস, নরওয়ে, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স সহ আরও অনেক দেশে প্রতিনিধিত্ব করেন মন্ত্রীরূপে।
তিন বার সাংসদ থাকাকালীন বিভিন্ন মন্ত্রকের সংসদীয় কমিটির সদস্য, উপদেষ্টা হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১১ সালে উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্ব প্রদানের লক্ষ্যে সংসদের সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট বিল পেশ করেন ও সে সময়ে দলীয় ও বিরোধী দলের নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা করে এই বিলের কার্যকরী রূপ দানে সচেষ্ট ছিলেন। ২০১৪ সালে সক্রিয় সাংসদীয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও রাজনীতি, শিক্ষা ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে বিরত রাখেননি। তাঁর জীবন ও কৃতিত্বকে সম্মান জানিয়ে ২০২৪ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে।



